• বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:৪৭ অপরাহ্ন
  • Bengali Bengali English English

এক জোনাকির গল্প

Nabil Ahammed / ৪২ বার পঠিত
আপডেট : বুধবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আমার মা নন্দিতা সরকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছিলেন। তিনি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৯ সালে অবসরে যাওয়ার আগে তাঁর কর্মস্থল ছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মা ছিলেন ক্যানসারজয়ী। ১০ বছর পর এবার আবার ক্যানসার ফিরে এসেছিল তাঁর শরীরে। সে জন্য এ মাসে কথা ছিল অস্ত্রোপচার করার। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৯ জানুয়ারি মা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।

মা ২০১০ সালে জরায়ু বা ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত হন। সেই সময় সফল অস্ত্রোপচারের পর ছয় সাইকেল কেমো নেন। এরপর থেকে শুরু হয় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লড়াই। নিয়মিত যোগব্যায়াম, ধ্যান, সাঁতার, পার্কে হাঁটা ইত্যাদি চালিয়ে গিয়ে তিনি পুরোই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছিলেন। এমনকি ভারতের সিএমসি ভেলোরের চিকিৎসকেরাও অন্য রোগীদের কাছে তাঁকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতেন। আমার সৌভাগ্য, ক্যানসার জয় করার লড়াইয়ে আমি আমার মায়ের সঙ্গী হতে পেরেছিলাম।

২০১০ সালের জুলাই মাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ পর্যায়ের ছাত্রী। একদিন ল্যাব থেকে বাসায় এসে দেখি মা পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন এবং রক্তপাত হয়েছে। এই ঘটনার প্রায় এক বছর আগেই মায়ের মেনোপজ হয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি ঢাকার অ্যাপোলো হসপিটালসে (বর্তমানে এভারকেয়ার হসপিটাল) ডা. রিতু আগরওয়ালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে পরিচিত একজন চিকিৎসকের পরামর্শে আমার মাকে একটা ব্যথানাশক ওষুধ দিলাম। ওষুধ নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মা সুস্থ বোধ করলেন। শনিবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া নিয়ে আমার সঙ্গে মায়ের তুমুল ঝগড়া হলো। তাঁর কথা, ‘সামান্য ব্যথার জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কী দরকার?’ তর্কে যথারীতি আমিই জয়ী হলাম। চিকিৎসক মাকে দেখে কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন। আমাকে আলাদাভাবে ডেকে জানালেন, তিনি ধারণা করছেন, মায়ের শরীরে ক্যানসার আছে।

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। অপেক্ষা করতে লাগলাম সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলের জন্য। তবে ফলাফল পজিটিভ এল। মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমরা তখন খোঁজ করতে শুরু করলাম কোথায় গেলে ভালো চিকিৎসা পাব। পঙ্কজ দাদুর (আমার মায়ের কাকা) পরামর্শে ভেলোরের সিএমসি হাসপাতালে গেলাম। সময় নষ্ট করতে চাইনি, সিদ্ধান্ত নিলাম, আমিই মাকে নিয়ে যাব ভেলোরে। সঙ্গে আমার বড় মামাও গেলেন।

মাকে দেখলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এলিস জর্জ। মাকে গাইনি প্রাইভেট ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলো। তখন স্মার্টফোনের তেমন একটা প্রচলন ছিল না। ওয়ার্ডে বসে আমার ল্যাপটপ দিয়ে গুগল করে সারা দিন আমার মাকে সফল ওভারিয়ান টিউমার অপারেশনের রোগীদের গল্প পড়ে শোনাতাম। এসব গল্প শুনে একসময় মা নিজের সমস্যাকে অনেক ছোট ভাবতে লাগলেন।

২৯ আগস্ট অস্ত্রোপচারের দিন মাকে সকাল ছয়টায় ওটিতে নেওয়া হলো। আমি বাইরে বসা। ঢাকা থেকে সবাই ফোন দিচ্ছে। সবাইকে একই খবর বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত বোধ হতে লাগল। বেলা একটার দিকে এলিস জর্জ বেরিয়ে এলেন। হাসিমুখে আমাকে বললেন, ‘অপারেশন সাকসেসফুল।’ যতটা আশঙ্কা করেছিলেন, টিউমারটা ততটা বড় নয়, তবে এখন এর বায়োপসি করা হবে—আসলেই ক্যানসার কি না।

আমি আর মা আশায় বুক বাঁধলাম, যেন ক্যানসার না হয়! কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যানসারই হলো। আমার মাকে এবার অনকোলজি বিভাগে নেওয়া হলো। এর মধ্যে আমার মামা চট্টগ্রামে ফিরে গেলেন। সেই সময়ে বাবা (মনোজ সেনগুপ্ত) আমার ছোট বোনকে (ত্রয়ী সেনগুপ্ত) নিয়ে ভেলোরে এসে পৌঁছালেন। পুরো পরিবারকে একসঙ্গে পেয়ে আমার মা ভীষণ আপ্লুত হলেন। বাবা আর ত্রয়ী আমাদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন থাকল। এরই মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন। এত শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও মা জন্মদিনে আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে নতুন জামা কিনতে বললেন। বাবাকে বললেন আমাদের নিয়ে ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে।

প্রথম কেমোর পর আমার বাবা আমাকে টাকাপয়সা বুঝিয়ে দিয়ে বোনকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলেন। কেমোথেরাপি নেওয়া আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধে যাওয়া প্রায় একই রকম ব্যাপার।

পরবর্তী কেমো দেওয়া হবে তিন সপ্তাহ পর। প্রথম কেমোর পর মায়ের মাথার চুল অর্ধেক হয়ে গেল। দ্বিতীয় কেমোর পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মায়ের মাথায় হাতে গোনা তিন-চারটা চুল। ছাত্রজীবনে আমার মায়ের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল ছিল। আমি খুব ভয়ে আছি, মা যখন আয়নায় নিজেকে দেখবেন, তখন কী করবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মা নিজেকে আয়নায় দেখলেন। খুবই স্বাভাবিক আচরণ করলেন। হাসতে হাসতে আমাকে বললেন, ‘এই কয়টা চুল থাকারই-বা কী দরকার ছিল? চলো আমরা ফটোইলেকট্রন আর ভিটামিন সি-যুক্ত খাবারের একটা তালিকা করে ফেলি, যেগুলো খেলে আমি কেমো নিয়েও ভালো থাকতে পারব।’ এরপর আর কোনো নেতিবাচক চিন্তা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। একে একে ছয়টা কেমো নিয়ে পুরো চিকিৎসাপ্রক্রিয়া হাসিমুখে সম্পন্ন করেছেন আমার মা। তারপর থেকে নিয়মিত বার্ষিক চেকআপ।

এক বছরের মাথায় আবার তাঁর মাথায় চুল গজিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি পেয়েছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে দুই ঘণ্টা সাঁতার কাটতেন, ভোরবেলা উঠে রমনা পার্কে গিয়ে যোগব্যায়াম করতেন, হাঁটতেন। খুব দ্রুত রান্না করতে পারতেন তিনি।

গত ৯ জানুয়ারি আমি আর মা আবার ভেলোর গিয়েছিলাম বার্ষিক চেকআপের জন্য। এবার গিয়ে জানতে পারি, ১০ বছর পর আবার মায়ের শরীরে ক্যানসার ফিরে এসেছে। করোনা টেস্ট নেগেটিভ এলে ২১ জানুয়ারি আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। চিকিৎসকেরা আমাদের আবারও ফেব্রুয়ারি মাসে ভেলোরে যেতে বলেন অস্ত্রোপচারের জন্য।

মা আমাকে একদিন বললেন, ‘করোনার জন্য এক বছর সাঁতার কাটা বন্ধ ছিল, তাই রিপোর্ট খারাপ এসেছে। নিয়মিত সাঁতার কাটলে ঠিকই আবার ভালো হয়ে যাব।’ ২২ জানুয়ারি আমি কোনোভাবেই তাঁকে যেতে দিতে রাজি হলাম না। পরদিন শনিবার আবার জেদ করলেন। আমি কেন জানি রাজি হলাম। আর সেটাই আমাদের কাল হলো। আমার মা কোভিডে আক্রান্ত হলেন। শরীরে তো ক্যানসার ছিলই। আমরা তাঁকে এবার আর ফেরাতে পারলাম না।

পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই মেধাবী আমার মা কোনো বড় তারকা ছিলেন না। কিন্তু যাঁরা তাঁর সম্পর্কে জানতেন, তাঁরা মাকে সম্মান দেখাতেন। একবার শুটিং করতে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছি। কথায় কথায় বলে ফেললাম, আমার ছোটবেলায় মা এখানে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হইহই পড়ে গেল। আমার মায়ের আমলে এখানে এসএসসি পরীক্ষায় নকল করা নাকি দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। এ রকম কথা মাকে নিয়ে অনেকেই বলতেন। মাকে নিয়ে এমন অসংখ্য গল্প আছে আমার স্মৃতির ঝুলিতে। আমার মায়ের মতো মানুষেরা আমাদের চারপাশেই আছেন—নীরবে নিজের কাজ করে জোনাকির মতো আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এমন মানুষদের উদ্দেশেই হয়তো কবি বলেছেন,

‘তুমি নও তো সূর্য, নও তো চন্দ্র,

তোমার তাই ব’লে কি কম আনন্দ।

তুমি আপন জীবন পূর্ণ ক’রে

আপন আলো জ্বেলেছ।’


এ জাতীয় আরো খবর..

করোনাভাইরাস